বনের চাতক - মনের চাতক/boner chatok - moner chatok by Jibanananda Das

বনের চাতক - মনের চাতক 
..............................

বনের চাতক বাঁধল বাসা মেঘের কিনারায় -
 মনের চাতক হারিয়ে গেল দূরের দুরাশায় । 
ফুঁপিয়ে ওঠে কাতর আকাশ সেই হতাশার ক্ষোভে -
সে কোন্ বোঁটের ফুলের ঠোঁটের মিঠা মদের লোভে 
বনের চাতক - মনের চাতক কাঁদছে অবেলায় ! 

পুবের হাওয়ায় হাপর জ্বলে , আগুনদানা ফাটে ! 
কোন ডাকিনীর বুকের চিতায় পচিম আকাশ টাটে ! 
বাদল - বৌয়ের চুমার মৌয়ের সােয়াদ চেয়ে চেয়ে 
বনের চাতক - মনের চাতক চলছে আকাশ বেয়ে , 
ঘাটের ভরা কলসি ও - কার কাঁদছে মাঠে মাঠে ! 

ওরে চাতক , বনের চাতক , আয় রে নেমে ধীরে 
নিঝুম ছায়া - বৌরা যেথা ঘুমায় দীঘি ঘিরে , 
‘ দে জল । ' ব'লে ফোঁপাস কেন ? মাটির কোলে জল 
খবর - খোঁজা সােজা চোখের সােহাগে ছলছল ! 
মজিস নে রে আকাশ - মুরুর মরীচিকার তীরে ।

মনের চাতক , হতাশ উদাস পাখায় দিয়ে পাড়ি 
কোথায় গেলি ঘরের কোণের কানাকানি ছাড়ি ? 
ননীর কলস আছে রে তার কাঁচা বুকের কাছে , 
আতার ক্ষীরের মতাে সােহাগ সেথায় ঘিরে আছে । 
আয় রে ফিরে দানােয় - পাওয়া , আয় রে তাড়াতাড়ি । 

বনের চাতক , মনের চাতক আসে না আর ফিরে , 
কপােত - ব্যথা বাজায় মেঘের শকুনপাখা ঘিরে । 
সে কোন্ ছুঁড়ির চুড়ি আকাশ - শুঁড়িখানায় বাজে । 
চিনিমাখা ছায়ায় ঢাকা চুনীর ঠোঁটের মাঝে 
লুকিয়ে আছে সে - কোন্ মধু মৌমাছিদের ভিড়ে ।


          - জীবনানন্দ দাশ                  

মরন /Moron by Rabindranath Tagore

মরন
..............

মরণ রে , 

তুঁহুঁ মম শ্যামসমান । 
মেঘবরণ তুঝ , মেঘজটাজুট ,
রক্ত কমলকর , রক্ত ' অধরপুট ,
তাপবিমােচন করুণ কোর তব 
মৃত্যু - অমৃত করে দান । 
তুঁহুঁ মম শ্যামসমান ।। 

মরণ রে ,

শ্যাম তোহারই নাম । 
চির বিসরল যব নিরদয় মাধব । 
তুঁহুঁ ন ভইবি মােয় বাম । 
আকুল রাধা - রিঝ অতি জরজর , 
ঝরাই নয়ন - দউ অনুখন করঝর , 
তুঁহুঁ মম মাধব , তুঁহুঁ মম দোসর , 
তুঁহুঁ মম তাপ ঘুচাও ।
মরণ তু আও রে আও ।।

ভুজপাশে তব লহ সম্বােধয়ি ,
আঁখিপাত মঝু আসব মােদয়ি ,
কোর - উপর তুঝ রােদয়ি রােদয়ি 
নীদ ভরব সব দেহ । 
তুঁহুঁ নহি বিসরবি , তুঁহুঁ নহি ছােড়বি ,
রাধা - হৃদয় তু কবহুঁ ন তােড়বি , 
হিয় হিয় রাখবি অনুদিন অনুখন ,
অতুলন তোঁহার লেহ ।। 

দূর সঙে তুঁহুঁ বাঁশি বজাওসি , 
অনুখন ডাকসি , অনুখন ডাকসি ,
'রাধা রাধা রাধা' । 
দিবস ফুরাওল , অবহুঁ ম যাওব , 
বিরহতাপ তব অবহুঁ ঘুচাওব , 
কুঞ্জবাট 'পর অবহুঁ ম ধাওব , 
সব কছু টুটই বাধা । 
গগন সঘন অব , তিমির মগনভব , 
তড়িত চকিত অতি , ঘাের মেঘরব ,
শাল তাল তরু সভয়তবধ সব , 
পন্থ বিজন অতি ঘাের । 
একলি যাব তুঝ অভিসারে , 
যাক পিয়া তুঁহুঁ কি ভয় তাহারে , 
ভয়বাধা সব অভয়মূর্তি ধরি 
পন্থ দেখায়ব মাের । 
ভানুসিংহ কহে , ছিয়ে ছিয়ে রাধা , 
চঞ্চল হৃদয় তােহারি— 
মাধব পহু মম , পিয় স মরণসে 
অব তুঁহুঁ দেখ বিচারি ৷৷৷


                                                         - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সুকুমার রায়ের জীবনী \Biography of Sukumar Roy

সুকুমার রায়



  • পিতা - উপেন্দ্রকিশোর রায়
  • মাতা - বিধুমুখী দেবী
  • ভাই বোন - পাঁচটি
  • জন্ম - ৩০ অক্টোবর ১৮৮৭
মসূয়া, কটিয়াদী,কিশোরগঞ্জ, ব্রিটিশ ভারত (আধুনিক বাংলাদেশ)
মৃত্যু - ১০ সেপ্টেম্বর ১৯২৩ (বয়স ৩৫)
১০০ নং গড়পার রোড, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত |
  • ছদ্মনাম - উহ্যনাম পণ্ডিত
  • পেশা -সাহিত্যিক
  • ভাষা - বাংলা
  • জাতীয়তা - ভারতীয়
  • শিক্ষা - বিএসসি (রসায়ন)
  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠান - প্রেসিডেন্সি কলেজ
  • সময়কাল - বাংলার নবজাগরণ
  • ধরন - শিশু সাহিত্য
  • দাম্পত্যসঙ্গী - সুপ্রভা দেবী
  • সন্তান - সত্যজিৎ রায়
  • আত্মীয় - লীলা মজুমদার, সুখলতা রাও, পুণ্যলতা চক্রবর্তী, সুবিনয় রায় চৌধুরী, সুবিমল রায় চৌধুরী, শান্তিলতা রায়

 
“সাগর যেথা লুটিয়ে পড়ে নতুন মেঘের দেশে
আকাশ-ধোয়া নীল যেখানে সাগর জলে মেশে।
মেঘের শিশু ঘুমায় সেথা আকাশ-দোলায় শুয়ে-
ভোরের রবি জাগায় তারে সোনার কাঠি ছুঁয়ে।
        —সুকুমার রায় রচিত ছড়ার অংশবিশেষ।


পারিবারিক ইতিহাস :-

রায় পরিবারের ইতিহাস থেকে জানা যায় তাঁদের পূর্বপুরুষ শ্রী রামসুন্দর দেও (দেব) আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার চাকদহ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন ৷ ভাগ্যচক্রে তিনি পৈতৃক গ্রাম ত্যাগ করে পূর্ববঙ্গের শেরপুরে গমন করেন ৷ সেখানে শেরপুরের জমিদার বাড়িতে তাঁর সাক্ষাৎ হয় যশোদলের জমিদার রাজা গুণীচন্দ্রের সাথে ৷ রাজা গুণীচন্দ্র রামসুন্দরের সুন্দর চেহারা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি দেখে মুগ্ধ হন এবং রামসুন্দরকে তাঁর সাথে তাঁর জমিদারিতে নিয়ে যান ৷ যশোদলে জমিজমা, ঘরবাড়ি দিয়ে তিনি রামসুন্দরকে তাঁর জামাতা বানান ৷ সেই থেকে রামসুন্দর যশোদলে বসবাস শুরু করেন ৷ তাঁর বংশধররা সেখান থেকে সরে গিয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলায় মসূয়া গ্রামে বসবাস শুরু করেন৷


জীবনী :-

সুকুমার রায় জন্মগ্রহন করেছিলেন  ১৮৮৭ সালের ৩০শে অক্টোবর,কলকাতার এক দক্ষিণ রাঢ়ীয় কায়স্থ বংশীয়,ব্রাহ্ম পরিবারে । সুকুমার রায়ের পিতা ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ,তিনি ছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যিক । সুকুমার রায়ের মা ছিলেন বিধুমুখী দেবী ,তিনি ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মেয়ে । তার আদিনিবাস বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার (বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলা) কটিয়াদি উপজেলার মসূয়া গ্রামে। মসূয়াতে বসবাসের আগে তাঁর পূর্বপুরুষের আদিনিবাস ছিল অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার অন্তর্গত চাকদহে ৷ সুকুমার রায়ের দুই ভাই সুবিনয় রায় ও সুবিমল রায় । এ ছাড়াও তার তিন বোন ছিল, তারা হলেন সুখলতা, পুণ্যলতা ও শান্তিলতা ।
সুকুমার রায় জন্মেছিলেন বাঙালি নবজাগরণের স্বর্ণযুগে । তার পারিবারিক পরিবেশ ছিল সাহিত্যানুরাগী, যা তার মধ্যকার সাহিত্যিক প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হয় । পিতা উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন শিশুতোষ গল্প ও জনপ্রিয়-বিজ্ঞান লেখক, চিত্রশিল্পী, সুরকার ও শৌখিন জ্যোতির্বিদ । উপেন্দ্রকিশোরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি সুকুমার রায়কে সরাসরি প্রভাবিত করেছিলেন । এছাড়াও রায় পরিবারের সাথে জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রমুখের সম্পর্ক ছিল । উপেন্দ্রকিশোর ছাপার ব্লক তৈরির কৌশল নিয়ে গবেষণা করেন, এ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান এবং মানসম্পন্ন ব্লক তৈরির একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন । মেসার্স ইউ. রয় এন্ড সন্স নামে ঐ প্রতিষ্ঠানের সাথে সুকুমার রায় যুক্ত ছিলেন ।


শিক্ষাজীবন :-

তিনি গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর কলকাতার সিটি স্কুল থেকে এন্ট্রাস পাশ করেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯০৬ সালে সুকুমার রায় ও পদার্থবিদ্যায় বি.এস.সি. (অনার্স) করার পর সুকুমার রায় মুদ্রণবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষার জন্য ১৯১১ সালে বিলেতে যান । সেখানে তিনি আলোকচিত্র ও মুদ্রণ প্রযুক্তির ওপর পড়াশোনা করেন এবং কালক্রমে তিনি ভারতের অগ্রগামী আলোকচিত্রী ও লিথোগ্রাফার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন । ১৯১৩ সালে সুকুমার রায় কলকাতাতে ফিরে আসেন।

সুকুমার রায় ইংল্যান্ডে পড়াকালীন, উপেন্দ্রকিশোর জমি ক্রয় করে, উন্নত-মানের রঙিন হাফটোন ব্লক তৈরি ও মুদ্রণক্ষম একটি ছাপাখানা স্থাপন করেছিলেন । তিনি ছোটদের একটি মাসিক পত্রিকা, ('সন্দেশ') এই সময় প্রকাশনা শুরু করেন । সুকুমারের বিলেত থেকে ফেরার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যু হয় । উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যুর পর সন্দেশ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব সুকুমার রায় নিজের কাঁধে তুলে নেন । শুরু হয় বাংলা শিশুসাহিত্যের এক নতুন অধ্যায়। পিতার মৃত্যুর পর আট বছর ধরে তিনি সন্দেশ ও পারিবারিক ছাপাখানা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন । তার ছোটভাই এই কাজে তার সহায়ক ছিলেন এবং পরিবারের অনেক সদস্য 'সন্দেশ'-এর জন্য নানাবিধ রচনা করে তাদের পাশে দাড়ান ।


কর্ম জীবন :-

সুকুমার রায়ের স্বল্পস্থায়ী জীবনে তার প্রতিভার শ্রেষ্ঠ বিকাশ লক্ষ্য করা যায় । সন্দেশের সম্পাদক থাকাকালীন তার লেখা ছড়া, গল্প ও প্রবন্ধ আজও বাংলা শিশুসাহিত্যে মাইলফলক হয়ে আছে । তার বহুমুখী প্রতিভার অনন্য প্রকাশ তার অসাধারণ ননসেন্স ছড়াগুলোতে । তার প্রথম ও একমাত্র ননসেন্স ছড়ার বই আবোল তাবোল শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বরং বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে নিজস্ব জায়গার দাবিদার ।

প্রেসিডেন্সী কলেজে পড়বার সময় তিনি ননসেন্স ক্লাব নামে একটি সংঘ গড়ে তুলেছিলেন । এর মুখপাত্র ছিল সাড়ে বত্রিশ ভাজা নামের একটি পত্রিকা। সেখানেই তার আবোল-তাবোল ছড়ার চর্চা শুরু । পরবর্তীতে ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর মানডে ক্লাব (ইংরেজি ভাষা: Monday Club) নামে একই ধরনের আরেকটি ক্লাব খুলেছিলেন তিনি । মনডে ক্লাবের সাপ্তাহিক সমাবেশে সদস্যরা 'জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ' পর্যন্ত সব বিষয়েই আলোচনা করতেন । সুকুমার রায় মজার ছড়ার আকারে এই সাপ্তাহিক সভার কয়েকটি আমন্ত্রণপত্র করেছিলেন সেগুলোর বিষয়বস্তু ছিল মুখ্যত উপস্থিতির অনুরোধ এবং বিশেষ সভার ঘোষণা ইত্যাদি ।

ইংলান্ডে থাকাকালীন তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের বিষয়ে কয়েকটি বক্তৃতাও দিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তখনও নোবেল পুরস্কার পাননি । ইতিমধ্যে সুকুমার লেখচিত্রী/প্রচ্ছদশিল্পীরূপেও সুনাম অর্জন করেছিলেন । তার প্রযুক্তিবিদের পরিচয় মেলে, নতুন পদ্ধতিতে হাফটোন ব্লক তৈরি আর ইংল্যান্ডের কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত তার প্রযুক্তি বিষয়ক রচনাগুলো থেকে ।

সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কার্য ছাড়াও সুকুমার রায় ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের সংস্কারপন্থী গোষ্ঠির এক তরুণ নেতা । ব্রাহ্ম সমাজ, রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত একেশ্বরবাদী, অদ্বৈতে বিশ্বাসী হিন্দুধর্মের এক শাখা যারা ৭ম শতকের অদ্বৈতবাদী হিন্দু পুরান ঈশ-উপনিষদ মতাদর্শে বিশ্বাসী । সুকুমার রায় 'অতীতের কথা' নামক একটি কাব্য রচনা করেছিলেন, যা ব্রাহ্ম সমাজের ইতিহাসকে সরল ভাষায় ব্যক্ত করে - ছোটদের মধ্যে ব্রাহ্ম সমাজের মতাদর্শের উপস্থপনা করার লক্ষে এই কাব্যটি একটি পুস্তিকার আকারে প্রকাশ করা হয় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি ওই সময়ের সবথেকে প্রসিদ্ধ ব্রাহ্ম ছিলেন, তার ব্রাহ্মসমাজের সভাপতিত্বের প্রস্তাবের পৃষ্ঠপোষকতা সুকুমার রায় করেছিলেন ।


মৃত্যু :-

১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে কালাজ্বরে (লেইশ্মানিয়াসিস) আক্রান্ত হয়ে মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে সুকুমার রায় মৃত্যুবরণ করেন,অনেক প্রচেষ্টা করেও তাকে বাঁচানো যায়নি সেই সময় এই রোগের কোনো চিকিৎসাই ছিল না । 


রচনাবলি :-

  • আবোল তাবোল
  • খাই-খাই
  • হ য ব র ল
  • পাগলা দাশু
  • হেশোরাম হুশিয়ারের ডায়েরি
  • অবাক জলপান
  • লক্ষ্মণের শক্তিশেল
  • ঝালাপালা ও অনান্য
  • নাটক,শব্দ কল্প দ্রুম
  • চলচ্চিত্তচঞ্চরী
  • বহুরুপী
  • ভাষার অত্যাচার |


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনী

 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনী 


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনী – Rabindranath Tagore Biography in Bengali :- বাংলা সাহিত্য জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে যদি কেউ থেকে থাকেন তাহলে সেটা অবশ্যই আমাদের সকলের প্রিয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত প্রথম বাঙালি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২ হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছিলেন। তাঁর লেখা অসাধারণ সব কবিতা ও গান, আজও প্রত্যেকটা বাঙালীর সমানভাবে মন কাঁড়ে । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা “গীতাঞ্জলি” এবং “জীবন স্মৃতি” আজও বাঙালির মনে চির স্মরণীয়।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে ছিলেন ?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাঙ্গালী কবি ,নাট্যকার ,গল্পকার,চিত্রকর,অভিনেতা,দার্শনিক, অভিনেতা, ছোটো গল্পকার । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে কবিগুরু, বিশ্বকবি বিভিন্ন নামে ভূষিত করা হয়। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ  করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলেন সকল দেশের সকল কালের এবং সকল মানবের তীর্থভূমি ।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম :-

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবির্ভাব হয়েছিলাে ১৮৬১ খ্রি : ৭ ই মে বাংলা ১২৬৮ সালের ২৫ শে বৈশাখ কলকাতার জোড়াসাঁকোর এক অভিজাত ব্রাহ্মন ( ঠাকুর ) পরিবারে । উনিশ শতকের সাহিত্য – সংস্কৃতির পীঠস্থান ছিলাে এই ঠাকুর পরিবার । 


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মাতা :-

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতার নাম মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর । মাতার নাম সারদা দেবী , তিনি ছিলেন একজন স্নেহময়ী মহিলা । রবীন্দ্রনাথের পিতামহের নাম প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর । তিনি একজন বিত্তশালী জমিদার ও জনহিতৈষী ছিলেন । ঠাকুর পরিবারের শিক্ষা – দীক্ষা , মার্জিত সাংস্কৃতিক চেতনা ও পিতার আলােকিত ধর্মবিশ্বাস কবির মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠেছিলাে।


 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পিতা – মাতার অষ্টম পুত্র । রবীন্দ্রনাথের প্রায় ১৪ বছর বয়সকালে তার মাতা সারদাদেবীর মৃত্যু হয় । 


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শৈশবকাল :-

শিশুকাল থেকেই অন্যান্য সন্তানদের মতাে রবীন্দ্রনাথ অভিজ্ঞ পরিচারকদের দ্বারা লালিত – পালিত হন । একজন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা এবং কয়েকজন গৃহশিক্ষকের কাছে তার প্রাথমিক বিদ্যালাভ শুরু হয় । বিভিন্ন স্কুলেও পড়েন কিছুদিন । কিন্তু স্কুলের বাঁধাধরা নিয়ম ও আবহাওয়া তার মনঃপুত না হওয়ায় বাড়িতেই পড়াশুনার ব্যবস্থা করা হয় । বাড়িতেই বিশ্ববিদ্যার সকল দুয়ার তার সম্মুখে উন্মুক্ত হয়ে গেল ।


শৈশবে রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্ম্যাল স্কুল, বেঙ্গল অ্যাকাডেমি এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে কিছুদিন করে পড়াশোনা করেছিলেন।কিন্তু বিদ্যালয়-শিক্ষায় অনাগ্রহী হওয়ায় বাড়িতেই গৃহশিক্ষক রেখে তার শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে অথবা বোলপুর ও পানিহাটির বাগানবাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করতেন রবীন্দ্রনাথ।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা :-

১৮৭৩ সালে এগারো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের উপনয়ন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর তিনি কয়েক মাসের জন্য পিতার সঙ্গে দেশভ্রমণে বের হন। প্রথমে তারা আসেন শান্তিনিকেতনে। এরপর পাঞ্জাবের অমৃতসরে কিছুকাল কাটিয়ে শিখদের উপাসনা পদ্ধতি পরিদর্শন করেন। শেষে পুত্রকে নিয়ে দেবেন্দ্রনাথ যান পাঞ্জাবেরই (অধুনা ভারতের হিমাচল প্রদেশ রাজ্যে অবস্থিত) ডালহৌসি শৈলশহরের নিকট বক্রোটায় ।  এখানকার বক্রোটা বাংলোয় বসে রবীন্দ্রনাথ পিতার কাছ থেকে সংস্কৃত ব্যাকরণ, ইংরেজি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান ও ইতিহাসের নিয়মিত পাঠ নিতে শুরু করেন। অল্প বয়স থেকেই রবীন্দ্রনাথের কবিপ্রতিভার উন্মেষ হয় । কিশাের কাল থেকেই শুরু করলেন নিরবচ্ছিন্ন কাব্যচর্চা । মাত্র তেরাে বছর বয়সেই তার প্রথম কবিতা ছাপা হয় তত্ত্ববােধিনী পত্রিকায় ।


 ১৮৭৮ সালে তিনি পড়াশুনার জন্য বিলেত ( লন্ডন ) যান । তিনি ব্যারিষ্টার হবেন এই অভিপ্রায়ে তাকে লন্ডন পাঠানাে হয় । কিন্তু সেখানে স্বল্পকাল অবস্থানের পরে পাশ্চাত্য জীবনাচরণ , সেখানকার সাহিত্য – সংস্কৃতির খবর ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সুরমূছনা নিয়ে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন । বড়ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রেরণায় এবার কবির প্রাণে এলাে গানের জোয়ার । রচনা করলেন অনবদ্য গীতিনাট্য ‘ বাল্মিকী প্রতিভা ।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যৌবনকাল :-

১৮৭৮ খ্রীষ্টাব্দে তার প্রথম বই ‘ কবিকাহিনী ’ প্রকাশিত হয় । তারপর একে একে প্রকাশিত হতে থাকে সন্ধ্যাসঙ্গীত , প্রভাত সঙ্গীত , ছবি ও গান , কড়ি ও কোমল , মানসী , সােনার তরী কাব্যসমূহ । তারপর বের হলাে চিত্রা , চৈতালী , কণিকা , কল্পনা , কথা ও কাহিনী , নৈবেদ্য , খেয়া , গীতাঞ্জলি , গীতালি ইত্যাদি


শুধু কাব্যই নয় , নাটক , প্রবন্ধ , গল্প , উপন্যাস , রসরচনা , সমালােচনা , রূপক নাটক , শিশুসাহিত্য , বিজ্ঞান , সমাজতত্ব , শিক্ষাতত্ব , সঙ্গীত , স্কুলপাঠ্য , ভ্রমণকাহিনী , সাহিত্য ও শিল্পের প্রায় সব ক্ষেতেই তার স্বচ্ছন্দ বিচরনের ফলে যােগফল হলাে বাংলা সাহিত্যের বর্তমান চরম উৎকর্ষ সাধন ও উন্নতি । তিনি প্রায় দু’হাজারের মতাে ছবিও এঁকেছেন ।


 ১৯১২ সালে গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় লন্ডনের ইন্ডিয়া সােসাইটি থেকে । সঙ্গে সঙ্গে প্রতীচ্যের বিদগ্ধ সমাজে সাড়া পড়ে যায় । আইরিশ কবি ডব্লিউ . বি . ইয়েস ইংরেজি গীতাঞ্জলির ভূমিকা লেখেন ।


 ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে ব্রিটিশরাজ কবিগুরুকে ‘ নাইট ’ উপাধিতে ভূষিত করেন । ১৯১৯ খ্রীঃ জালিওয়ালাবাগে নিরস্ত্র ভারতীয়দের ব্রিটিশ সৈন্যরা নির্মমভাবে হত্যা করলে তার প্রতিবাদে তিনি ঐ উপাধি । পরিত্যাগ করেন ।


 রবীন্দ্রনাথ ইউরােপ , আমেরিকা , চীন , জাপান , রাশিয়া , মালয় , পারস্য প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন এবং এইসব দেশে বহু বক্তৃতা ও রচনা পাঠ করেন । পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ভাষাতেই তাঁর রচনা প্রকাশিত হয়েছে । বিশ্বের সকল দেশের বিদগ্ধ মানুষ , কবি , লেখক , বুদ্ধিজীবীরা তাকে মনীষী হিসাবে শ্রদ্ধা করেন ।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্ম জীবন :-

ভারতী পত্রিকায় ১৮৭৭ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ রচনা প্রকাশ করেন। সেগুলো ছিলো ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী, মেঘনাদবধ কাব্যের সমালোচনা আর ভিখারিণী ও করুণা নামে দুটো সুন্দর ছোটগল্প। এগুলোর মধ্যে ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পায়।


এরপর ১৮৭৮ সালে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্যগ্রন্থ “কবিকাহিনী”। এছাড়াও পরে তিনি রচনা করেছিলেন “সন্ধ্যাসংগীত” নামক আরেকটি কাব্যগ্রন্থ। “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” নামে লেখা তাঁর সেই বিখ্যাত কবিতা এই কাব্যগ্রন্থেরই অন্তর্গত ছিলো।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিয়ে :-

ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে আশার পর, অবশেষে ১৮৮৩ সালে ৯ই ডিসেম্বর তারিখে রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হয় বেণীমাধব রায়চৌধুরী নামে ঠাকুরবাড়ির এক অধস্তন কর্মচারীর কন্যা ভবতারিণীর সঙ্গে । বিয়ের সময় ভবতারিণীর পুণরায় নামকরণ করা হয় এবং তাঁর নাম পাল্টে রাখা হয় মৃণালিনী দেবী ।


পরবর্তীকালে, মৃণালিনী দেবী ও রবীন্দ্রনাথের মোট পাঁচ সন্তান হয় । তাঁদের নাম যথাক্রমে ছিলো- মাধুরীলতা (১৮৮৬–১৯১৮), রথীন্দ্রনাথ (১৮৮৮–১৯৬১),  রেণুকা (১৮৯১–১৯০৩),  মীরা (১৮৯৪–১৯৬৯) এবং শমীন্দ্রনাথ (১৮৯৬–১৯০৭) ।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এঁদের মধ্যে অতি অল্প বয়সেই রেণুকা ও শমীন্দ্রনাথ মারা যায় ।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্য জীবন :-

 ১৯০১ খ্রীষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে একটি আদর্শ বিদ্যালয় স্থাপন করেন । দেশী – বিদেশী বহু জ্ঞানী – গুণী ব্যক্তিত্ব এখানে শিক্ষকতা করতেন । আজ তা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় রূপে খ্যাত ।


 তাঁর রচিত দুটি সঙ্গীত ‘ জনগণমন অধিনায়ক জয় হে ” এবং” আমার সােনার বাংলা” যথাক্রমে ভারতের এবং বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতরূপে গৃহিত ও সমাদৃত । 


রবীন্দ্রনাথ তাঁর জমিদারী পরিচালনার জন্য দীর্ঘদিন বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার শিলাইদহে কাটিয়েছেন । তাঁর সােনার তরী ‘ কাব্যগ্রন্থ এবং বহু ছােটগল্পের রচনার পটভূমি এই শিলাইদহ ।


 ১৯১৩ খ্রীষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ তার গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার নােবেল পুরস্কার লাভ করেন । তিনিই নােবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম ভারতীয় এবং প্রথম এশিয়াবাসী ।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষজীবন :-

 জীবনের শেষ চার বছর ছিল তার ধারাবাহিক শারীরিক অসুস্থতার সময়। এই সময়ের মধ্যে দুইবার অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল তাকে। ১৯৩৭ সালে একবার অচৈতন্য হয়ে গিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থা হয়েছিল কবির। সেবার সেরে উঠলেও ১৯৪০ সালে অসুস্থ হওয়ার পর আর তিনি সেরে উঠতে পারেননি। এই সময়পর্বে রচিত রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলি ছিল মৃত্যুচেতনাকে কেন্দ্র করে সৃজিত কিছু অবিস্মরণীয় পংক্তিমালা। মৃত্যুর সাত দিন আগে পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিশীল ছিলেন।দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৪১ সালে জোড়াসাঁকোর বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।[১৯৪১ খ্রীষ্টাব্দের ৭ ই আগষ্ট বিশ্বকবি মহামনীষী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতা , জোড়াসাঁকোয় মহাপ্রয়াণে যাত্রা করেন । ২৫ শে বৈশাখের সূর্য ( রবি ) ২২ শে শ্রাবণের সন্ধ্যায় অস্ত যায়।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বভ্রমণ :-

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট বারো বার বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছিলেন।১৮৭৮ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে তিনি পাঁচটি মহাদেশের ত্রিশটিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেন।

রবীন্দ্রনাথ যেসকল বইতে তার বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাগুলি লিপিবদ্ধ করে রাখেন সেগুলি হল: য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র (১৮৮১), য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি (১৮৯১, ১৮৯৩), জাপান-যাত্রী (১৯১৯), যাত্রী (পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি ও জাভা-যাত্রীর পত্র, ১৯২৯), রাশিয়ার চিঠি (১৯৩১), পারস্যে (১৯৩৬) ও পথের সঞ্চয় (১৯৩৯)।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকর্ম :-

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন মূলত এক কবি। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি কাব্যরচনা শুরু করেন। তার প্রকাশিত মৌলিক কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৫২। তবে বাঙালি সমাজে তার জনপ্রিয়তা প্রধানত সংগীতস্রষ্টা হিসেবে। রবীন্দ্রনাথ প্রায় দুই হাজার গান লিখেছিলেন। কবিতা ও গান ছাড়াও তিনি ১৩টি উপন্যাস, ৯৫টি ছোটগল্প, ৩৬টি প্রবন্ধ ও গদ্যগ্রন্থ এবং ৩৮টি নাটক রচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র রচনা রবীন্দ্র রচনাবলী নামে ৩২ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। তার প্রবর্তিত নৃত্যশৈলী “রবীন্দ্রনৃত্য” নামে পরিচিত।


শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা :-

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেক বছর আগে বোলপুরের শান্তিনিকেতনে, এক বিশাল জমি কেনেন । সেখানে তিনি ১৮৮৮ সালে একটা আশ্রম ও ১৮৯১ সালে একটা ব্রহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন ।

বাবার সেই কেনা জমিতে রবীন্দ্রনাথ একটা শিক্ষাকেন্দ্র তৈরী করতে চেয়েছিলেন । তাই প্রথমে তিনি সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন “পাঠ্য ভবন” নামে একটা স্কুল, যেটা বাকি সব স্কুলের থেকে বেশ আলাদা ছিলো । কারণ সেই স্কুল ছিলো সম্পূর্ণ খোলা আকাশের নীচে একটা গাছের তলায় ।

পরে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি সেই স্কুলকে আরো বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যে সেটাকে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করেন । যেটার পরবর্তীকালে নাম রাখেন তিনি “বিশ্বভারতী” যা ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ।

সমাজের পিছিয়ে পরা মানুষদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে তিনি আবার ১৯২৪ সালে আরেকটি শিক্ষাকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা করেন যেটা ছিলো “শিক্ষা সত্র” । তিনি এই প্রতিষ্ঠান মাত্র ৭ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে শুরু করেছিলেন।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা :-

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধিক কবিতা লিখেছেন।তার মধ্যে রয়েছে ১৮৯০ সালে প্রকাশিত মানসী, সোনার তরী (১৮৯৪), চিত্রা (১৮৯৬), চৈতালি (১৮৯৬), কল্পনা (১৯০০) ও ক্ষণিকা (১৯০০) কাব্যগ্রন্থে ফুটে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের প্রেম ও সৌন্দর্য সম্পর্কিত রোম্যান্টিক ভাবনা।এছাড়াও পলাতকা (১৯১৮) কাব্যে গল্প-কবিতার আকারে তিনি নারীজীবনের সমসাময়িক সমস্যাগুলি তুলে ধরেন।বহির্বিশ্বে তার সর্বাপেক্ষা সুপরিচিত কাব্যগ্রন্থটি হল গীতাঞ্জলি। এ বইটির জন্যই তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটো গল্প :-

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ছোট গল্পকার ।তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গল্প হল “কঙ্কাল”, “নিশীথে”, “মণিহারা”, “ক্ষুধিত পাষাণ”, “স্ত্রীর পত্র”, “নষ্টনীড়”, “কাবুলিওয়ালা”, “হৈমন্তী”, “দেনাপাওনা”, “মুসলমানীর গল্প” ইত্যাদি।

রবীন্দ্রনাথের একাধিক ছোটগল্প চলচ্চিত্র, নাটক ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মিত হয়েছে। তার গল্পের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রায়ণ হল সত্যজিৎ রায় পরিচালিত তিন কন্যা ও চারুলতা ,তপন সিংহ পরিচালিত অতিথি, কাবুলিওয়ালা ও ক্ষুধিত পাষাণ, পূর্ণেন্দু পত্রী পরিচালিত স্ত্রীর পত্র ইত্যাদি।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস :-

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট তেরোটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন। এগুলি হল: বৌ-ঠাকুরাণীর হাট (১৮৮৩), রাজর্ষি (১৮৮৭), চোখের বালি (১৯০৩), নৌকাডুবি (১৯০৬), প্রজাপতির নির্বন্ধ (১৯০৮), গোরা (১৯১০), ঘরে বাইরে (১৯১৬), চতুরঙ্গ (১৯১৬), যোগাযোগ (১৯২৯), শেষের কবিতা (১৯২৯), দুই বোন (১৯৩৩), মালঞ্চ (১৯৩৪) ও চার অধ্যায় (১৯৩৪)। রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপন্যাস রচনার প্রচেষ্টা হল বৌ-ঠাকুরাণীর হাট ও রাজর্ষি ।


বৌ-ঠাকুরাণীর হাট ও রাজর্ষি ঐতিহাসিক উপন্যাস। চোখের বালি উপন্যাসে দেখানো হয়েছে সমসাময়িককালে বিধবাদের জীবনের নানা সমস্যা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সত্যজিৎ রায়ের ঘরে বাইরে ও ঋতুপর্ণ ঘোষের চোখের বালি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাট্য সাহিত্য :-

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধারে ছিলেন নাট্যকার ও নাট্যাভিনেতা। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পারিবারিক নাট্যমঞ্চে মাত্র ষোলো বছর বয়সে অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত হঠাৎ নবাব নাটকে ও পরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথেরই অলীকবাবু নাটকে নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৮৮১ সালে তার প্রথম গীতিনাট্য বাল্মীকিপ্রতিভা মঞ্চস্থ হয়।এই নাটকে তিনি ঋষি বাল্মীকির ভূমিকায় অভিনয়  করেছিলেন। 


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজনৈতিক দর্শন :-

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজনৈতিক দর্শন অত্যন্ত জটিল। ১৮৯০ সালে প্রকাশিত মানসী কাব্যগ্রন্থের কয়েকটি কবিতায় রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি নাইটহুড বর্জন করেন।নাইটহুড প্রত্যাখ্যান-পত্রে লর্ড চেমসফোর্ডকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “আমার এই প্রতিবাদ আমার আতঙ্কিত দেশবাসীর মৌনযন্ত্রণার অভিব্যক্তি।” রবীন্দ্রনাথের “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য” ও “একলা চলো রে” রাজনৈতিক রচনা হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। “একলা চলো রে” গানটি গান্ধীজির বিশেষ প্রিয় ছিল।যদিও মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল অম্লমধুর। হিন্দু নিম্নবর্ণীয় জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গান্ধীজি ও আম্বেডকরের যে মতবিরোধের সূত্রপাত হয়, তা নিরসনেও রবীন্দ্রনাথ বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ফলে গান্ধীজিও তার অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠান সমূহ :-

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় : ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের একটি কেন্দ্রীয়  বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার বোলপুর শহরে অবস্থিত। 

রবীন্দ্র সেতু: রবীন্দ্র সেতু (পূর্বনাম হাওড়া ব্রিজ) হুগলি নদীর উপর অবস্থিত কলকাতা ও হাওড়া শহরের মধ্যে সংযোগরক্ষাকারী সেতুগুলির মধ্যে অন্যতম হল রবীন্দ্র সেতু। ১৮৭৪ সালে প্রথম হাওড়া সেতু নির্মিত হয়। পরে ১৯৪৫ সালে পুরনো সেতুটির বদলে বর্তমান বহির্বাহু সেতুটির উদ্বোধন হয়। ১৯৬৫ সালের ১৪ জুন সেতুটির নাম পরিবর্তন করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে রবীন্দ্র সেতু রাখা হয়।

রবীন্দ্রসদন: পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় অবস্থিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামাঙ্কিত একটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি প্রেক্ষাগৃহ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হল রবীন্দ্রসদন (পূর্বনাম রবীন্দ্রস্মরণী) । এটি দক্ষিণ কলকাতার নন্দন-রবীন্দ্রসদন সাংস্কৃতিক চত্বরে অবস্থিত।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়:  কলকাতার একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হল রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৬২ সালের ৮ মে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়।জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হল এই বিশ্ববিদ্যালয়।


রবীন্দ্রনাথের পুরষ্কার এবং অর্জনসমূহ :-

১৯৪০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যাল)য় তাঁকে শান্তিনিকেতনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে “ডক্টরেট অব লিটারেচার” সন্মানে ভূষিত করে ।

বিদেশে তাঁর রচিত গীতাঞ্জলী কাব্য, বিশেষ জনপ্রিয়তা পায় । সেই সুবাদে তাঁকে ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দিয়ে সন্মানিত করা হয় ।

১৯১৫ সালে তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নাইট উপাধি পান । কিন্তু ১৯১৯ সালে ঘটে যাওয়া জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের পর তিনি সেই উপাধি ত্যাগ করেন ।

১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথের আঁকা একটা ছবি, প্যারিস ও লন্ডনে প্রদর্শিত হয় ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপানের ডার্টিংটন হল স্কুলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ।

৭ই মে ১৯৬১ সালে, ভারতীয় ডাকবিভাগ সম্মান জ্ঞাপনের উদেশ্যে; তাঁর ছবি দেওয়া একটা ডাক টিকিট প্রকাশ করে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে আশ্চর্যজনক তথ্য :-

মাত্র আট বছর বয়স থেকেই তিনি কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন ।

তিনি চিরাচরিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে একদম তুচ্ছ মনে করতেন এবং সেই চিরাচরিত শিক্ষার অধীনে থেকে পড়তে ভালোবাসতেন না ।

তিনি ভারতীয় সাহিত্য ও কলায় বিপ্লবের উদ্দেশ্যে, বাংলায় নবজাগরণ আন্দোলন শুরু করেছিলেন ।

বিখ্যাত সিনেমা পরিচালক সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক কর্মকান্ডে বিশেষভাবে প্রভাবিত হন । “পথের পাঁচালী” সিনেমায় পরিচিত সেই ট্রেনের দৃশ্য, আসলে কবিগুরু রচিত “চোখের বালিতে” বর্ণিত একটা ঘটনার থেকে অনুপ্রাণিত ছিলো ।

রবীন্দ্রনাথ একজন মহান সুরকারও ছিলেন ।  তিনি প্রায় দুই হাজারেরও বেশি গান নিজে রচনা করেছিলেন ।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু :-

জীবনের শেষ কিছু বছর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ধারাবাহিক ভাবে শারীরিক অসুস্থতার শিকার হন । রোগ যেন তাঁকে কিছুতেই ছাড়তেই চাইছিলো না । দুবার তো তিনি এমন অসুস্থ হন, যারজন্য তাঁকে বহুদিন বিছানায় শয্যাশায়ী অবস্থায় পরে থাকতে হয় ।

জানা যায় ১৯৩৭ সালে কবি একবার অচৈতন্য হয়ে গিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থার শিকার হন । যদিও তিনি সেইসময় সেবার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন ঠিকই কিন্তু ১৯৪০ সালে আবার গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর তিনি আর সেরে উঠতে পারেননি ।

অবশেষে দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৪১ সালের ৭ই আগস্ট তারিখে, জোড়াসাঁকোর বাসভবনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি । মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিলো প্রায় ৮০ বছর ।


চিনতে পারােনি \ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

 চিনতে পারােনি

যে-কোনো রাস্তায় যে-কোনো লোককে ডেকে বলো,

তুমি আমার বাল্যকালের খেলার সঙ্গী,
মনে পড়ে না ?
কেন তোমার ব্যস্ত ভঙ্গি ?
কেন আমায় এড়িয়ে যাবার চঞ্চলতা !
আমার অনেক কথা ছিল, তােমার জামার বােতাম ঘিরে
অনেক কথা
এই মুখ, এই ভূরুর পাশে চোরা চাহনি,
চিনতে পারােনি ?

যে-কোনো রাস্তায় যে-কোনো লোককে ডেকে বলো,
আমি তােমার বাল্যকালের খেলার সঙ্গী
মনে পড়ে না ?
আমরা ছিলাম গাছের ছায়া, ঝড়ের হাওয়ায় ঝড়ের হাওয়া
আমরা ছিলাম দুপুরে রুক্ষ
ছুটি শেষের সমান দুঃখ-
এই দ্যাখো সেই গ্রীবার ক্ষত, এই যে দ্যাখো চেনা আঙ্গুল
এখনো ভুল ?
মনে হয় না তােমার সেই নিরুদ্দেশ সখার মতো ?
কেন তোমার পাংশু, চিবুক, কেন তােমার প্রতিরােধের
কঠিন ভঙ্গি
চিনতে পারেনি ?


যে-কোনাে রাস্তায় যে-কোনো লোককে ডেকে বলো,
শত্রু; নই তাে, আমারা সেই ছেলেবেলার খেলার সঙ্গী
মনে পড়ে না ?

আমরা ছিলাম নদীর বাঁকে ঘূর্ণিপাকে সন্ধেবেলা
নিষিদ্ধ দেশ, ভাঙা মন্দির, দু’ চোখে ধোঁয়া
দেবী মানবীর প্রথম দ্বিধা, প্রথম ছোঁয়া, আমৃত্যু পণ
গােপন গ্রন্থে এক শিহরণ, কৈশােরময় তুমুল খেলা …
লুকোচুরির খেলার শেষে কেউ কারোকে খুঁজে পাইনি
দ্যাখো সে মুখ, চোরা চাহনি
একই আয়না
চিনতে পারো না ?
                      
                                                                                       - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

বীরপুরুষ । রবীন্দ্রনা ঠাকুর । 


একটি শিশির বিন্দু | Ekti Shishir Bindu by rabindranath tagore

একটি শিশির বিন্দু


 বহু দিন ধরে' বহু ক্রোশ দূরে

      বহু ব্যয় করি,বহু দেশ ঘুরে

দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,

            দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।


      দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

      ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

একটি ধানের শিষের উপরে

            একটি শিশিরবিন্দু।

              
                                                 - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |

রথযাত্রা | Ratha Yatra By Rabindranath Tagore Poem

 রথযাত্রা 


তাই রানী রাজাকে বললে, “চলো, রথ দেখতে যাই।

রাজা বললে, “আচ্ছা।

ঘোড়াশাল থেকে ঘোড়া বেরোল, হাতিশাল থেকে হাতি। ময়ূরপংখি যায় সারে সারে, আর বল্লম হাতে সারে সারে সিপাইসান্ত্রি। দাসদাসী দলে দলে পিছে পিছে চলল।

কেবল বাকি রইল একজন। রাজবাড়ির ঝাঁটার কাঠি কুড়িয়ে আনা তার কাজ।

সর্দার এসে দয়া করে তাকে বললে, “ওরে, তুই যাবি তো আয়।

সে হাত জোড় করে বললে, “আমার যাওয়া ঘটবে না।

রাজার কানে কথা উঠল, সবাই সঙ্গে যায়, কেবল সেই দুঃখীটা যায় না।

রাজা দয়া করে মন্ত্রীকে বললে, “ওকেও ডেকে নিয়ো।

রাস্তার ধারে তার বাড়ি। হাতি যখন সেইখানে পৌঁছল মন্ত্রী তাকে ডেকে বললে, “ওরে দুঃখী, ঠাকুর দেখবি চল্‌।

সে হাত জোড় করে বলল, “কত চলব। ঠাকুরের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছই এমন সাধ্য কি আমার আছে।

মন্ত্রী বললে, “ভয় কী রে তোর, রাজার সঙ্গে চলবি।

সে বললে, “সর্বনাশ! রাজার পথ কি আমার পথ!

মন্ত্রী বললে, “তবে তোর উপায়? তোর ভাগ্যে কি রথযাত্রা দেখা ঘটবে না।

সে বললে, “ঘটবে বৈকি। ঠাকুর তো রথে করেই আমার দুয়ারে আসেন।

মন্ত্রী হেসে উঠল। বললে, “তোর দুয়ারে রথের চিহ্ন কই।

দুঃখী বললে, “তাঁর রথের চিহ্ন পড়ে না।

মন্ত্রী বললে, “কেন বল্‌ তো।

দুঃখী বললে, “তিনি যে আসেন পুষ্পকরথে।

মন্ত্রী বললে, “কই রে সেই রথ।

দুঃখী দেখিয়ে দিলে, তার দুয়ারের দুই পাশে দুটি সূর্যমুখী ফুটে আছে।


                                                                      -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর                                    

হঠাৎ দেখা / Hothat Dekha Bengali Poem by Rabindranath Thakur


হঠাৎ দেখা


রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা ,

ভাবিনি সম্ভব হবে কোনদিন  ।।


আগে ওকে বারবার দেখেছি

লাল রঙের শাড়িতে  –

দালিম-ফুলের মত রাঙা; 

আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়, 

আঁচল তুলেছে মাথায় 

দোলন-চাঁপার মত চিকন-গৌর মুখখানি ঘিরে  ।

মনে হল, কাল রঙের একটা গভীর দূরত্ব 

ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে , 

যে দূরত্ব সর্ষেক্ষেতের শেষ সীমানায় 

শালবনের নীলাঞ্জনে  । 

থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা  

চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে  ।। 


হঠাৎ খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে 

আমাকে করলে নমস্কার  ।

সমাজবিধির পথ গেল খুলে 

আলাপ করলেম শুরু  –

‘কেমন আছো ‘, ‘কেমন চলছে সংসার ‘ ইত্যাদি  ।

সে রইল জানালার বাইরের দিকে চেয়ে

যেন কাছের-দিনের-ছোঁয়াচ-পার-হওয়া চাহনিতে  ।

দিলে অত্যন্ত ছোটো দুটো-একটা জবাব ,

কোনটা বা দিলেই না  ।

বুঝিয়ে দিলে হাতের অস্থিরতায় –

কেন এ-সব কথা ,

এর চেয়ে অনেক ভাল চুপ ক’রে থাকা  ।।


আমি ছিলেম অন্য বেঞ্চিতে ওর সাথিদের সঙ্গে  ।

এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানালে কাছে আসতে  ।

মনে হল কম সাহস নয় –

বসলুম ওর এক বেঞ্চিতে  ।


গাড়ির আওয়াজের আড়ালে

বললে মৃদুস্বরে ,

‘কিছু মনে কোরো না ,

সময় কোথা সময় নষ্ট করবার  !

আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই ;

দূরে যাবে তুমি ,

তাই, যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে ,

শুনব তোমার মুখে ।

সত্য করে বলবে তো ?’


আমি বললাম ,’ বলব  ।’

বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল,

‘আমাদের গেছে যে দিন

একেবারেই কি গেছে  –

কিছুই কি নেই বাকি?’


একটুকু রইলেম চুপ করে ;

তার পর বললেম ,

‘রাতের সব তারাই আছে

দিনের আলোর গভীরে  ।’


খটকা লাগল , কী জানি বানিয়ে বললেম নাকি  ।

ও বললে , ‘ থাক এখন যাও ও দিকে  ।’

সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে  ।

আমি চললেম একা  ।।


                                                                      - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের

সোনার তরী /Sonar Tori by Rabindranath Tagore

 সোনার তরী 


গনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।রাশি রাশি ভারা ভারাধান-কাটা হল সারা,ভরা নদী ক্ষুরধারাখরপরশা–কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা॥


একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা -- চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।পরপারে দেখি আঁকাতরুছায়ামসী-মাখাগ্রামখানি মেঘে ঢাকাপ্রভাতবেলা—এপারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা॥


গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে!দেখে যেন মনে হয়, চিনি উহারে।ভরা পালে চলে যায়,কোনো দিকে নাহি চায়,ঢেউগুলি নিরুপায়ভাঙে দু ধারে—দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে॥


ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে?বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।যেয়ো যেথা যেতে চাও,যারে খুশি তারে দাও-শুধু তুমি নিয়ে যাওক্ষণিক হেসেআমার সোনার ধান কূলেতে এসে॥  


যত চাও তত লও তরণী-পরে।আর আছে?-আর নাই, দিয়েছি ভরে॥এতকাল নদীকূলেযাহা লয়ে ছিনু ভুলেসকলি দিলাম তুলেথরে বিথরে-এখন আমারে লহো করুণা ক’রে॥


ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরীআমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।শ্রাবণগগন ঘিরেঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,শূন্য নদীর তীরেরহি নু পড়ি-যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী॥


                                                                                             -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দুই বিঘা জমি /Dui Bigha Jomi (Two Bighas of Land)

 দুই বিঘা জমি

শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই  আর সবই গেছে ঋণে।
বাবু বলিলেন, “বুঝেছ উপেন,  এ জমি লইব কিনে।’
কহিলাম আমি, “তুমি ভূস্বামী,  ভূমির অন্ত নাই।
চেয়ে দেখো মোর আছে বড়ো-জোর   মরিবার মতো ঠাঁই।’
শুনি রাজা কহে, “বাপু, জানো তো হে, করেছি বাগানখান
পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দিঘে  সমান হইবে টানা–
ওটা দিতে হবে।’ কহিলাম তবে  বক্ষে জুড়িয়া পাণি
সজল চক্ষে, “করুণ বক্ষে  গরিবের ভিটেখানি।
সপ্ত পুরুষ যেথায় মানুষ  সে মাটি সোনার বাড়া,
দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে  এমনি লক্ষ্মীছাড়া!’
আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল  রহিল মৌনভাবে,
কহিলেন শেষে ক্রূর হাসি হেসে, “আচ্ছা, সে দেখা যাবে।’

পরে মাস দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে  বাহির হইনু পথে–
করিল ডিক্রি, সকলই বিক্রি  মিথ্যা দেনার খতে।
এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায়  আছে যার ভূরি ভূরি–
রাজার হস্ত করে সমস্ত  কাঙালের ধন চুরি।
মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান  রাখিবে না মোহগর্তে,
তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল   দু বিঘার পরিবর্তে।
সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে   হইয়া সাধুর শিষ্য
কত হেরিলাম মনোহর ধাম, কত মনোরম দৃশ্য!
ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে  যখন যেখানে ভ্রমি
তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে  সেই দুই বিঘা জমি।
হাটে মাঠে বাটে এই মতো কাটে  বছর পনেরো-ষোলো–
একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে  বড়ই বাসনা হল।

নমোনমো নম সুন্দরী মম  জননী বঙ্গভূমি!
গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর,  জীবন জুড়ালে তুমি।
অবারিত মাঠ, গগনললাট  চুমে তব পদধূলি,
ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড়  ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।
পল্লবঘন আম্রকানন  রাখালের খেলাগেহ,
স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল–  নিশীথশীতল স্নেহ।
বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ  জল লয়ে যায় ঘরে–
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।
দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে  প্রবেশিনু নিজগ্রামে–
কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি  রথতলা করি বামে,
রাখি হাটখোলা, নন্দীর গোলা, মন্দির করি পাছে
তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে  আমার বাড়ির কাছে।

ধিক্‌ ধিক্‌ ওরে, শতধিক্‌ তোরে, নিলাজ কুলটা ভূমি!
যখনি যাহার তখনি তাহার,  এই কি জননী তুমি!
সে কি মনে হবে একদিন যবে  ছিলে দরিদ্রমাতা
আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া  ফল ফুল শাক পাতা!
আজ কোন্‌ রীতে কারে ভুলাইতে  ধরেছ বিলাসবেশ–
পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা,পুষ্পে খচিত কেশ!
আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন–
তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন!
ধনীর আদরে গরব না ধরে !  এতই হয়েছ ভিন্ন
কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ  সেদিনের কোনো চিহ্ন!
কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ি, ক্ষুধাহরা সুধারাশি!
যত হাসো আজ যত করো সাজ  ছিলে দেবী, হলে দাসী।

বিদীর্ণ হিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া  চারি দিকে চেয়ে দেখি–
প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে,  সেই আমগাছ একি!
বসি তার তলে নয়নের জলে  শান্ত হইল ব্যথা,
একে একে মনে উদিল স্মরণে  বালক-কালের কথা।
সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে  রাত্রে নাহিকো ঘুম,
অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি  আম কুড়াবার ধুম।
সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর,  পাঠশালা-পলায়ন–
ভাবিলাম হায় আর কি কোথায়  ফিরে পাব সে জীবন!
সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস  শাখা দুলাইয়া গাছে,
দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল  আমার কোলের কাছে।
ভাবিলাম মনে বুঝি এতখনে  আমারে চিনিল মাতা,
স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে  বারেক ঠেকানু মাথা।

হেনকালে হায় যমদূত-প্রায় কোথা হতে এল মালী,
ঝুঁটি-বাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে  পাড়িতে লাগিল গালি।
কহিলাম তবে, “আমি তো নীরবে  দিয়েছি আমার সব–
দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব!’
চিনিল না মোরে, নিয়ে গেল ধরে  কাঁধে তুলি লাঠিগাছ–
বাবু ছিপ হাতে পারিষদ-সাথে ধরিতেছিলেন মাছ।
শুনি বিবরণ ক্রোধে তিনি কন, “মারিয়া করিব খুন!’
বাবু যত বলে পারিষদ-দলে  বলে তার শতগুণ।
আমি কহিলাম, “শুধু দুটি আম  ভিখ মাগি মহাশয়!’
বাবু কহে হেসে, “বেটা সাধুবেশে  পাকা চোর অতিশয়।’
আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে–
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে!


– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর                       

দেশলাই কাঠি /deshlai kathi

দেশলাই কাঠি

দেশলাই কাঠি 


আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি
এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি নাঃ
তবু জেনো
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ-
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;
আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।

মনে আছে সেদিন হুলস্থূল বেধেছিল?
ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন-
আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়!
কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,
কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাৎ
আমি একাই- ছোট্ট একটা দেশলাই কাঠি।

এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে
তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের?
মনে নেই? এই সেদিন-
আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে;
চমকে উঠেছিলে-
আমরা শুনেছিলাম তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ।

আমাদের কী অসীম শক্তি
তা তো অনুভব করেছ বারংবার;
তবু কেন বোঝো না,
আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে,
আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব
শহরে, গঞ্জে , গ্রামে- দিগন্ত থেকে দিগন্তে।
আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়
তা তো তোমরা জানোই!
কিন্তু তোমরা তো জানো না:
কবে আমরা জ্বলে উঠব-
সবাই শেষবারের মতো!

                  - সুকান্ত ভট্টাচার্য 






বীরপুরুষ/Birpurush


বীরপুরূষ


মনে করাে , যেন বিদেশ ঘুরে 
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে ।
তুমি যাচ্ছ পালকিতে , মা , চড়ে 
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে , 
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘােড়ার পরে
টগবগিয়ে তােমার পাশে পাশে । 
রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে 
রাঙা ধুলােয় মেঘ উড়িয়ে আসে ।

সন্ধে হল , সূর্য নামে পাটে ,
এলেম যেন জোড়াদিঘির মাঠে । 
ধূ ধূ করে যে দিক - পানে চাই , 
কোনোখানে জনমানব নাই , 
তুমি যেন আপন মনে তাই 
ভয় পেয়েছ - ভাবছ , ' এলেম কোথা '।
আমি বলছি , “ ভয় কোরাে না মা গো , 
ওই দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা । '

চোরকাঁটাতে মাঠ রয়েছে ঢেকে ,
মাঝখানেতে পথ গিয়েছে বেঁকে ।
গােরু বাছুর নেইকো কোনােখানে । 
সন্ধে হতেই গেছে গাঁয়ের পানে , 
আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে— 
অন্ধকারে দেখা যায় না ভালাে । 
তুমি যেন বললে আমায় ডেকে , 
দিঘির ধারে ওই - যে কিসের আলাে ? 

এমন সময় হাঁরে রে রে রে রে ’ 
এই - যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে 
তুমি ভয়ে পাল্কিতে এক কোণে 
ঠাকুর - দেবতা স্মরণ করছ মনে । 
বেয়ারাগুলাে পাশের কাঁটাবনে । 
পালকি ছেড়ে কাঁপছে থরােথরাে । 
আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে , 
আমি আছি , ভয় কেন , মা , করাে । 

হাতে লাঠি , মাথায় ঝাঁকড়া চুল 
কানে তাদের গোঁজা জবার ফুল । 
আমি বলি , “ দাঁড়া খবরদার , 
এক পা কাছে আসিস যদি আর 
এই চেয়ে দেখ আমার তলােয়ার , 
টুকরাে করে দেব তােদের সেরে । 
শুনে তারা লম্ফ দিয়ে উঠে 
চেঁচিয়ে উঠল হাঁরে রে রে রে ' ।

তুমি বললে , ' যাস নে খােকা ওরে ! 
আমি বলি , “ দেখাে না চুপ করে । 
ছুটিয়ে ঘােড়া গেলেম তাদের মাঝে , 
ঢাল তলােয়ার ঝঝনিয়ে বাজে , 
কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে । 
শুনে তােমার গায়ে দেবে কাঁটা । 
কত লােক যে পালিয়ে গেল.ভয়ে , 
কত লােকের মাথা পড়ল কাটা । 

এত লােকের সঙ্গে লড়াই করে 
ভাবছ খােকা গেলই বুঝি মরে ।
আমি তখন রক্ত মেখে ঘেমে । 
বলছি এসে , ' লড়াই গেছে থেমে । 
তুমি শুনে পালকি থেমে নেমে 
চুমাে খেয়ে নিচ্ছ আমায় কোলে । 
বলছ , ' ভাগ্যে খােকা সঙ্গে ছিল , 
কী দুর্দশাই হত তা না হলে । 

রােজ কত কী ঘটে যাহা তাহা -
এমন কেন সত্যি হয় না আহা ? 
ঠিক যেন এক গল্প হত তবে , 
শুনত যারা অবাক হত সবে 
দাদা বলত , কেমন করে হবে , 
খােকার গায়ে এক কি জোর আছে । 
পাড়ার লােকে সবাই বলত শুনে , 
ভাগ্যে খােকা ছিল মায়ের কাছে । 

                                   - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

                       




মহিমময় শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস অমৃত উপদেশ:-

সরলভাবে বলো,হে ঈশ্বর,দেখা দাও,আর কাঁদো;আর বলো,
হে ঈশ্বর,কামিনী-কাঞ্চন থেকে মন তফাত কর ! 
আর ডুব দাও।উপর উপর ভাসলে বা সাঁতার দিলে কি রত্ন পাওয়া যায় ?

পাগল হও,ঈশ্বরের প্রেমে পাগল হও |

সব কাজ করবে কিন্তু মন ঈশ্বরেতে রাখবে |
স্ত্রী ,পুত্র ,পিতা ,মা ,সকলকে নিয়ে থাকবে ও সেবা করবে,
যেন কত আপনার লোক ।  কিন্তু মনে জানবে যে তারা তোমার কেউ নয় ।

ঈশ্বরে ভক্তিলাভ না করে যদি সংসার করতে যাও তাহলে আরও জড়িয়ে পড়বে ।
বিপদ,শোক,তাপ এসবে অধৈর্য হয়ে যাবে ।

সত্য বলছি,তোমরা সংসার করছ এতে দোষ নাই । 
তবে ঈশ্বরে দিকে মন রাখতে হবে । 
তা না হলে হবে না। এক হাতে কর্ম করো,আর এক হাতে  ঈশ্বরকে ধরে থাকো । 
কর্ম শেষ হলে দুই হাতে ঈশ্বরকে ধরবে ।